নীল বাতির আভায় ঘেরা রাহুলের বাড়ি, উৎকণ্ঠায় পড়শি ও সহকর্মীরা

২৯ মার্চের সন্ধ্যা যেন হঠাৎই এক বিষণ্ণ কবিতার পংক্তি হয়ে নামল বিজয়গড়ে। আচমকা ছড়িয়ে পড়ল খবর—আর নেই রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে পারেননি। গুঞ্জন, ফিসফাস, অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল ৬/৮৮ বিজয়গড় রোডের অনন্যা অ্যাপার্টমেন্টে।

তালসারিতে শুটিংয়ের পর জলে নেমেছিলেন রাহুল? ছবি: সংগৃহীত।

২৯ মার্চের সন্ধ্যা যেন হঠাৎই এক বিষণ্ণ কবিতার পংক্তি হয়ে নামল বিজয়গড়ে। আচমকা ছড়িয়ে পড়ল খবর—আর নেই রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে পারেননি। গুঞ্জন, ফিসফাস, অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল ৬/৮৮ বিজয়গড় রোডের অনন্যা অ্যাপার্টমেন্টে।

তিনতলার সেই চেনা বারান্দা, যেখানে দাঁড়িয়ে হয়তো বহুবার হাসিমুখে হাত নেড়েছিলেন ‘বাবিন’, আজ যেন স্থির হয়ে আছে। পাড়ার সবার প্রিয় বাবিন—এই নামেই যাঁকে চিনত সবাই—তিনি আর নেই, এই সত্যটা মেনে নিতে সময় লেগেছে অনেকেরই।

সন্ধ্যার আলো ফিকে হতে না হতেই ধীরে ধীরে জমতে থাকে ভিড়। প্রথমে নিস্তব্ধতা, তারপর ধীরে ধীরে কান্না আর অবিশ্বাসের ঢেউ। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন সত্যিটাও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে—এটা আর গুজব নয়, এটাই নির্মম বাস্তব।

বিজয়গড় মোড়ে তখন মানুষের ঢল। একে একে এসে পৌঁছচ্ছেন টলিপাড়ার পরিচিত মুখেরা। সুদীপ্তা চক্রবর্তী, দেবলীনা দত্ত, সৌম্য মুখোপাধ্যায়—সবাই যেন এক গভীর শূন্যতা নিয়ে দাঁড়িয়ে। পুরনো দিনের স্মৃতি বয়ে নিয়ে এলেন অমিত দাস, যিনি একসময় রাহুলের পথচলার সঙ্গী ছিলেন। তাঁর কণ্ঠে কাঁপন—“ওর সঙ্গে কত স্মৃতি… উপরে গিয়ে ওর জামাকাপড়গুলো দেখে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।”

এই শোকের ভিড়ে এসে পৌঁছলেন প্রিয়াঙ্কা সরকার। চোখে অব্যক্ত যন্ত্রণা, মুখে নীরবতা। কিছুক্ষণ শাশুড়ির পাশে থেকে আবার ছুটে গেলেন ছেলের কাছে। রাত বাড়তে বাড়তে আবার ফিরলেন—এইবার যেন আরও ভেঙে পড়া এক মা, এক স্ত্রী হয়ে। পাশে ছোট্ট সহজ, যে হয়তো এখনও বুঝতেই পারেনি তার পৃথিবীটা কতটা বদলে গেছে।

পাড়ার মানুষদের মুখে শুধু স্মৃতি আর স্মৃতি। কেউ বলছেন, “কালও তো দেখলাম…”, কেউ বলছেন, “ওর মধ্যে কোনও তারকাসুলভ দূরত্ব ছিল না।” যেন প্রতিটা স্মৃতিই আজ বেদনার কাঁটা হয়ে বিঁধছে।

রাত আরও গভীর হলে এসে পৌঁছলেন সহিনী সরকার, শোভন গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরভ দাস, দর্শনা বণিক, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়—সবাই এক অদৃশ্য শোকের সুতোয় বাঁধা। অনন্যা আবাসনের সামনে সেই মোমোর দোকানিও আজ স্মৃতিতে ডুবে—“দাদা মোমো খুব ভালোবাসত… ভাবতেই পারছি না…”

একজন প্রতিবেশীর কণ্ঠে প্রশ্ন—“এত বড় মানুষ, এমন করে চলে গেলেন? কিছু যেন ঠিক মনে হচ্ছে না…” সেই প্রশ্নের উত্তর নেই, শুধু নিঃশব্দ অশ্রু আছে।

রাত দেড়টা পেরিয়ে গেলেও আলো নিভল না। প্রিয়াঙ্কা বসে আছেন রাহুলের মায়ের পাশে, দু’জনের মাঝখানে এক গভীর শূন্যতা। ধীরে ধীরে ভিড় কমে এল, সবাই ফিরে গেল নিজেদের ঘরে—কিন্তু সেই শূন্যতা রয়ে গেল একইরকম।

ChatGPT Image

দূর থেকে এখনও দেখা যাচ্ছে—রাহুলের ঘরের সেই টিমটিম করে জ্বলতে থাকা নীল আলো। যেন শেষবারের মতো কিছু বলতে চাইছে, কিছু না বলা কথা ভাসিয়ে দিচ্ছে রাতের নিস্তব্ধতায়।

এখন শুধু অপেক্ষা—শেষবারের মতো বাড়ি ফেরার। সোমবার দুপুর যেন আরেকটি কঠিন বিদায়ের সাক্ষী হতে চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *